সংসারে কাজের মাঝেও নিজের মনের যত্ন ও মানসিক শান্তি কিভাবে পাবেন: যুক্তিসঙ্গত কথোপকথন

 

সংসারে-কাজের-মাঝেও-নিজের-মনের-যত্ন-ও-মানসিক- শান্তি-কিভাবে-পাবে


- তোমার সবসময় ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালো লাগে? তুমি একটুও বোর ফিল করো না তাই না?


- কথাটা বলার আগে দুবার নিজের মনকে এই একই প্রশ্নটা করো। তাহলে নিজেই তার উত্তর পেয়ে যাবে। আমার মুখ থেকে আর শুনতে হবে না।


- তুমি তো প্রতিদিনই অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয়েই ফোনে ব্যস্ত হয়ে পরো। বাড়ির মানুষ গুলোর সাথে একটুও সময় কাটাতে তোমার ইচ্ছা করে না তাই না?


- যথেষ্ট সময় দিই তোমায় সুমিত্রা। তবু তোমার একই বিষয় নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করার স্বভাবটা যাবে না। আচ্ছা আমি তো একটা পুরুষ মানুষ। সারাদিন অফিস, কাজ সামলে একটু ফোনে সময় কাটাই। স্ট্রেসটা একটু কমে। তোমার এটুকুও সহ্য হয় না বলো? নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নটা একবার রাখো,  আমি সত্যিই কি ফোন নিয়েই সারাদিন বসে থাকি? কাজকর্ম করি না?


- সে কথা আমি তোমায় একটাবার ও বলি নি। মদ্দা কথা হলো তুমি আমায় কোনোদিন বোঝো নি। আর বুঝতেও চাও নি। শুধু দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোকেই পাশে থাকা বলে না সূর্য। স্বামীর কর্তব্য পালন করা আর মানসিক দিক থেকে স্ত্রীকে খুশিতে রাখা এ দুটোর মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। 


- সুমিত্রা মানুষ আজকাল নানা কাজে ব্যস্ত। নিজের মানসিক সুখের জন্য অন্যের উপর ডিপেন্ড করাটা বন্ধ করো। তোমার মেন্টালিটিটা এখনও ডেভলভ হয় নি। নামেই তোমার বয়স বেড়েছে। 


- কিছু বললেই তুমি এইসব বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথার পাহাড় সাজিয়ে আমায় দমিয়ে রাখার চেষ্টা করো। আমি কি কিছু বুঝি না?


- না, তুমি কিছুই বোঝো না। তোমার মনটা এখনও টিন এজ দের মতো প্রেম চায়, ভালোবাসা চায়। একটু রোমান্স চায়। ভালোবাসার পরশের অনুভূতি উপভোগ করতে চায়। সবই আমি বুঝি সুমিত্রা। ভালো আমিও তোমায় বাসি। কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশের ধরণ সবাইয়ের একই রকম হয় না। দিনরাত ভালোবাসি ভালোবাসি বললেই সেটা ভালোবাসা । আর কেউ যদি ভালোবাসার প্রকাশ না করে তার মধ্যে ভালোবাসার অনুভূতি নেই এই ধারণা তোমার সম্পূর্ণ ভুল বুঝলে?


- তুমি আমায় ভালোবাসো না একথা তোমায় একবারও বলি নি। শুধু বলেছি আমায় সময় দাও না। যেটা সত্যি আমি সেটাই বলেছি। আমি সারাদিন সংসারের কাজের মধ্যে দিনপাত করি। তোমার দেখাশোনা, ছেলের যত্ন, মা বাবার খেয়াল রাখা সংসারের প্রতিটা কাজ নিজে হাতে সামলাই একা হাতে। দিন শেষে আমারও তো একটু একান্তে তোমার সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে জাগে তুমি বলো? তুমি তো সারাদিন অফিসে থাকো। অফিস স্টাফে দের সাথে, বাইরে বন্ধু বান্ধব দের সাথে একটু আড্ডা দাও। প্রতিদিন বাইরে বেরও। আর আমি সারাদিন ঘর বন্দি হয়ে পরে থাকি। মুখ গুজে হাসি মুখে সব কাজ করি। সন্ধ্যে নামলেই তোমার আসার অপেক্ষায় থাকি। একসাথে একটু বসে চা খাবো। মান ও অভিমানের গল্প হবে। তোমার সারাদিনের অভিজ্ঞতা আমার সাথে ভাগ করে নেবে। এটুকু আশা করাও কি আমার খুব অপরাধ বলো? 


- না অপরাধ নয়। তোমার মনে জমা অভাব, অনুযোগের নালিশ গুলো সব গুলোই চরম বাস্তব সুমিত্রা। মানছি , ভুল কিছুটা আমারও আছে। কিন্তু পুরোটা নয়। আমার মনে হয় তোমার লাইফ স্টাইলটা একটু বদলানো দরকার। 


- তোমার কথার কিছু মানে বুঝলাম না। লাইফ স্টাইল কেন চেঞ্জ করব? 


- এদিকে এসো, পাশে বসো বুঝিয়ে বলছি। 


- ছাড়ো, আর ওতো আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। 


- ওতো রাগ করতে নেই। এসো। পাশে বসো। কিছু কথা তোমায় বলার আছে। 


- কি বলবে বলো। আমি এখান থেকেই শুনতে পাবো।


- আসতে বলছি এসো। 


- হুম বলো এবার। 


- রাগ করে আছো সুমি?


- না। মেয়ে মানুষদের রাগ করা সাজে না। আমরা হলাম সংসারের পুতুল। আমাদের সারাজীবন দিয়েই যেতে হবে। বিনিময়ে কিছু আশা করা যাবে না। 


- ওহ! তাই নাকি? তা এই ডায়লগটা কোথা থেকে শিখলে শুনি? সন্ধ্যেবেলায় যে কূটকচালিতে ভরা টিভি সিরিয়াল গুলো হয় সেখান থেকে?


- যদি বলি হ্যাঁ। ওখান থেকেই শিখেছি। ঐ বোকা বাক্সটা পর্যন্তও মানুষকে বিনোদন দিতে জানে, আনন্দ দেয়, মন কেমনের সঙ্গী হয়। তবু এখন রক্ত মাংসের মানুষের কাছে সেই দাবি করা চলে না।


- সুমি বাস্তবটা কে একটু বোঝার চেষ্টা করো। আসলে তোমার জীবনটা বড্ড বেশি একঘেয়ে। রোজকার সেই একই কাজ, একই জীবনধারা এসব করতে করতে তুমি বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছো। নিজের জীবনটাকে তো একটু অন্যভাবেও উপলব্ধি করতে পারো?


- কিভাবে?


- সংসারের কাজের মাঝেও নিজের ভালোলাগার কোনো কিছু নিয়ে একটু চর্চা করো। অনুশীলন করো। দেখবে নিজের লাইফ স্টাইলে নতুনত্ব ফিরে পাবে। এক অদ্ভুত শান্তি পাবে। 


- কি করব বলো?


- তোমার যেটা মন চায় তুমি সেটাই করো। মনের কথা শোনো। মনের যত্ন নাও। নিজের ভালোলাগার বিষয় গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকো। দেখবে জীবনটা কি সুন্দর বদলে গেছে। আর আমি তো সব সময় আছি তোমার পাশে। মুখে ভালোবাসি না বললেও পাশে আছি সর্বদা। তোমার যখন যা দরকার আমায় বলবে আমি সাধ্য মতো চেষ্টা করব তোমার সাথে থাকার।


- ঠিকই বলেছ সূর্য। আসলে আমার জীবনের কোনো বৈচিত্র্য নেই। তাই নিজেকে খুব একাকী মনে হয়। সারাদিন কাজের পর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তুমি সারাদিন কাজের পর এসে একটু রিল্যাক্স করার জন্য মোবাইল দেখো। এটা কোনো অপরাধ নয়। আমি জানি। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারি না। কিন্তু আজ তুমি আমায় জীবনে আনন্দ করে বাঁচার অন্য একটা পথ দেখালে।


- রিয়েলি সুমি? তা আমার বক্তব্য থেকে তুমি কিভাবে মোটিভেট হলে শুনি?


- আমি ভাবছি  নানারকম জুয়েলারি তৈরি করা শিখবো। সুতো দিয়ে, ক্লে দিয়ে, তারপর অনেক সব জাঙ্ক জুয়েলারি এখন বাজারে উঠেছে। চাহিদাও খুব। ভাবছি শিখে তৈরি করে সেল করব। 


- বাহ! দারুন তো আইডিয়াটা। এ ব্যাপারে তোমার কোনো সাহায্য লাগলে আমায় জানাবে কিন্তু। তুমি যদি এসব নিয়ে নিজেকে একটু ব্যস্ত রাখো দেখবে তোমার নিজের একটা ক্যারিয়ারও তৈরি হবে আর তুমি স্বনির্ভর শীল ও হবে। আবার মানসিক প্রশান্তি ও পাবে।


- আমার চেনা জানা একজন এইসব হাতের কাজ শেখায়। ওনার কাছে তাহলে ভর্তি হয়ে যাই বলো?


- হ্যাঁ। আর সংসারের কাজ সেরে ওসব করতে যদি টাইম ম্যানেজ করতে না পারো একটা মেড রেখে দিতে পারো। 


- না না। আমার অসুবিধা হবে না। টাইম ম্যানেজমেন্ট করে আমি সবটা করে নেব।।


- তুমি তাহলে আগামী কালই যোগাযোগ করো ওখানে।


- আচ্ছা ঠিক আছে । রাত অনেক হলো। এবার ডিনার করতে হবে তো?


- হ্যাঁ। মা , বাবা, আর বাবুর খাওয়া হয়ে গেছে?


- হ্যাঁ। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। মা বাবা ঘুমিয়েও পড়েছেন । বাবু আঁকা প্রাকটিস করছে। চলো খেয়ে নিই। খাবারটা রেডি করি। তুমি ততক্ষণ একটা ভালো পাব সিরিজ খুঁজে রাখো মোবাইলে একসঙ্গে দেখতে দেখতে খাবো।


সমাপ্ত





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ